দরজায় কড়া নাড়ছে কোয়ান্টাম কম্পউটার!!




কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরিতে কে কার আগে যাবে, তা নিয়ে ইঁদুরদৌড়ে নেমেছে সবাই। ছবি: সংগৃহীত



আমরা সবাই কম্পিউটার বলতে বুঝি প্রচলিত ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ কম্পিউটার কে। কিন্ত এবার আসতে চলেছে প্রচলিত কম্পিটারের তুলনায় কয়েক'শ গুন শক্তিশালী কোয়ান্টম কম্পিউটার।


যেসব গাণিতিক সমস্যা মানুষ দূরে থাক, হালের সুপার কম্পিউটারের করতেও বছরের পর বছর লাগে, সেসব সমস্যা এক তুড়িতে সমাধান করতে পারবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কার করতে সহায়তা করবে এটি। নতুন পদার্থ আবিষ্কারেও আসবে বৈপ্লবিক গতি। এক কথায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রযুক্তিবিশ্বে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। পুরো কম্পিউটার ব্যবস্থাই বদলে যাবে

কোয়ান্টাম কম্পিউটার কীভাবে কাজ করে?
সাধারণ কম্পিউটার কাজ করে বাইনারি সংখ্যা দিয়ে। বাইনারি পদ্ধতিতে সংখ্যা মাত্র দুটি: ০ ও ১। এই দুটি সংখ্যা দিয়েই যাবতীয় কাজ করে এখনকার কম্পিউটার। দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান ব্যবস্থায় প্রতিবার হয় ০ নতুবা ১ ব্যবহার করতে পারে কম্পিউটার। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার ০ ও ১—দুটিরই প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। আবার একই সময়ে একই সঙ্গে ০ ও ১–এর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। বিশেষ এই কম্পিউটারের মৌলিক একককে বলা হয় কিউবিটস। বাইনারি সংখ্যা হিসেবে ০ ও ১ ব্যবহারের অনবদ্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার জটিল গাণিতিক সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে পারে।
ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বোধ্য ও জটিল কোয়ান্টাম মেকানিকসের ওপর নির্ভরশীল কোয়ান্টাম কম্পিউটার। কোয়ান্টাম মেকানিকসের সুপারপজিশন ও এনট্যাংগেলমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহার করে কাজ করে এই কম্পিউটার। খুব বেশিসংখ্যক গাণিতিক সমস্যার সমাধান এটি করে না। তবে যে অল্পসংখ্যক জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান কোয়ান্টাম কম্পিউটার করে, সেগুলো বর্তমানের কম্পিউটারের পক্ষে করা অত্যন্ত কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। কিছু ক্ষেত্রে অসম্ভবও।
সংবাদমাধ্যম ওয়্যারড বলছে, কোয়ান্টাম বিটস বা কিউবিটস নানা পদ্ধতিতে গঠিত হতে পারে। তবে এগুলো সব সময়ই ০ ও ১-এর প্রতিনিধিত্ব করে এবং এই পুরো প্রক্রিয়া ইলেকট্রনিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে প্রথাগত কম্পিউটার বিটসের চেয়ে বহুগুণ বেশি কাজ করতে পারে কিউবিটস।
সুফল কী?
টেলিগ্রাফ বলছে, কার্যকর কোয়ান্টাম কম্পিউটার অসীম সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। নতুন টেকসই নির্মাণসামগ্রী তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। ক্যানসার বা এইডসের মতো দুরারোগ্য ব্যাধির পথ্য তৈরিতে সহায়তা করবে এটি।
মাইক্রোসফটের কর্মকর্তা ক্রিস্তা সোরে বলেন, ‘এর প্রভাব হবে অভাবনীয়। কোয়ান্টাম কি করতে পারে—সেই সম্ভাবনার বিশাল সমুদ্রের কেবল উপরিভাগে আছি আমরা। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সাহায্য নিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতার সমস্যার প্রকৃতি বুঝতে পারব আমরা। একই সঙ্গে কীভাবে কার্বন ধরে রাখা যাবে এবং আমাদের পৃথিবীকে বাঁচানো যাবে, তাও জানতে পারব।’
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইবিএমের কোয়ান্টাম বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট বব সুটর মনে করেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রযুক্তিতে নতুন বিপ্লবের সূচনা করবে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এখনো এ বিষয়ের বিস্তৃতি আঁচ করতে পারছে না। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কল্যাণে মানুষ আরও ভালো পণ্য হাতে পাবে, খাবারে আসবে নতুন স্বাদ। তৈরি হবে নতুন নতুন ওষুধ। জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে বর্তমানের উড়োজাহাজকে আরও দ্রুতগামী করা যাবে। এসব উন্নত উড়োজাহাজতে আবার জ্বালানিও কম খরচ হবে।
আইবিএমের গবেষণা বিভাগ জানাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। এতে করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও নিখুঁত করে তোলা সম্ভব হবে।

সমস্যাটা কোথায়?
কথায় আছে—‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।’ ঠিক তেমনি ভালো মানুষের হাতে পড়লে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সম্ভাবনার শেষ নেই। আর ভুল মানুষের হাতে পড়লে এই কোয়ান্টাম কম্পিউটার হয়ে দাঁড়াবে সীমাহীন ভোগান্তির কারণ। শুধু একবার ভেবে দেখুন—আপনার ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট থেকে শুরু করে এটিএম পাসওয়ার্ডও চলে গেছে অন্যের হাতে! কী, গা শিউরে উঠছে না?
টেলিগ্রাফ বলছে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার হালের ইন্টারনেটের ক্রিপ্টোগ্রাফি নিমেষে ব্রেক করতে পারবে। ফলে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে এই কম্পিউটার থাকলে এত দিন ধরে চলে আসা ইন্টারনেট ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য বেহাত হয়ে যাবে। হ্যাক করা যাবে সরকারি ডেটাবেইস। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ধস নামবে। ইন্টারনেটভিত্তিক অর্থ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে পারবে অসৎ হ্যাকাররা। আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও ধসিয়ে দেওয়া যাবে।
নটিংহাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটির কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বিশেষজ্ঞ কলিন উইলমট বলেন, যে পক্ষ সবার আগে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মালিক হবে, সেই পক্ষই এই অসীম ক্ষমতার অধিকারী হবে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার ক্ল্যাসিক ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবস্থাকে বিশাল ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
ইকোনমিস্ট বলছে, কোয়ান্টাম কম্পিউটারের অপব্যবহার বিশ্বব্যাপী দুই ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যমানের ই-কমার্স শিল্পকে ধ্বংস করে দিতে পারে। কারণ, বর্তমানে প্রচলিত ইন্টারনেট ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করেই এসব আর্থিক লেনদেন করা হয়ে থাকে। এই ক্রিপ্টোগ্রাফি রাষ্ট্রীয় তথ্যের গোপনীয়তাকেও সুরক্ষিত রাখে। সুতরাং এই ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে পারলে ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের বিস্তারিত তথ্য, ব্যাংকে লেনদেন, যাবতীয় ই-মেইল—এক কথায় ইন্টারনেট–সংশ্লিষ্ট সব তথ্যই অরক্ষিত হয়ে পড়বে। তখন যে–কেউ এসব তথ্যে নাক গলাতে পারবে, পারবে চুরি করতেও।
সমস্যা আছে রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়েও। নেদারল্যান্ডসের রাডবাউন্ড ইউনিভার্সিটির ক্রিপ্টোগ্রাফার পিটার সোয়েব বলেন, ‘আজ থেকে ১০-২০ বছর পর কেউ যদি আমার আজকের খুদে বার্তা বা ব্যাংক হিসাব দেখতে পান, তবে আমার মতো সাধারণ মানুষের হয়তো কিছু যাবে–আসবে না। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন, আমি যদি একটি দমনমূলক রাষ্ট্রের নাগরিক হই, তখন কী হবে? এটি কি তখন দমনের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠবে না?’

তথ্যঃ প্রথম আলো

No comments

Powered by Blogger.